চিলমারী সংবাদদাতা-
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ব্রহ্মপুত্রের তীরে ভিড় জমাতে শুরু করেন হাজারো ভক্ত। ঠান্ডা পানির স্রোত উপেক্ষা করে, কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ
“ওঁ ব্রহ্মপুত্র মহাভাগ শান্তনোঃ কুলনন্দনঃ,
অমোঘোগর্ভসম্ভূতো পাপং লৌহিত্য মে হর”।
এই প্রার্থনায় পাপ মোচনের আশায় পবিত্র স্নানে মেতে ওঠেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ভোর থেকেই কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরীর নুনখাওয়া ঘাট, সদর উপজেলার যাত্রাপুর, চিলমারীর জোড়গাছ ও রমনা ঘাটজুড়ে দেখা যায় মানুষের ঢল। কয়েক লাখ পূণ্যার্থীর উপস্থিতিতে পুরো ব্রহ্মপুত্র তীর যেন এক বিশাল ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়।
প্রতি বছর বাংলা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে আয়োজিত এই স্নানোৎসব ‘অষ্টমীর স্নান’ নামে পরিচিত। সনাতনী পঞ্জিকা অনুযায়ী এ বছর পবিত্র স্নানের নির্ধারিত সময় ছিল ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট এবং দুপুর ১২টা ৩ মিনিট থেকে ২টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত।
ভারতের আসাম থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ কুড়িগ্রাম দিয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী ও চর রাজিবপুর হয়ে প্রবাহিত এই নদ ঘিরেই গড়ে উঠেছে প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই স্নানোৎসবের ঐতিহ্য। সময়ের সাথে সাথে এর পরিধি বেড়েছে, আর ভক্তদের অংশগ্রহণও পৌঁছেছে কয়েক লাখে।
উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিটি ঘাটেই ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক টিম, অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ঘাটের আয়োজক কমিটির সদস্য কাঞ্চন সরকার জানান, “এখানে গঙ্গাধর, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র এই তিনটি নদীর মিলনস্থল, যাকে ত্রিধারা বলা হয়। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্থানে স্নান করলে পাপ মোচন হয়।”
লোকবিশ্বাসও এই উৎসবকে আরও তাৎপর্যমণ্ডিত করেছে। চিলমারীর জোড়গাছ ঘাটে স্নান করতে আসা উত্তম মোহন্ত বলেন, “ঋষি পরশুরাম মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে এই ব্রহ্মপুত্রে স্নান করেছিলেন।এমন বিশ্বাস থেকেই আমরা প্রতিবছর এখানে আসি।”
রংপুর থেকে আসা শিউলী রানী দাস জানান, “পরিবার নিয়ে প্রতি বছরই এখানে আসি। এই পবিত্র স্নানে অংশ নিলে মনের পাপ দূর হয়—এই বিশ্বাস আমাদের টানে।”
দিনভর ব্রহ্মপুত্র তীরজুড়ে ছিল এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ। ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ঘাটগুলো, আর নদীর জলে প্রতিফলিত হয় বিশ্বাস, ভক্তি আর শতবর্ষের ঐতিহ্য।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “স্নানোৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে, যাতে ভক্তরা নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন।”



0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য করার জন্য অনুরোধ করা হল।